কেন বিখ্যাত ব্যক্তিরা ভয় পেতেন যে তাদেরকে জীবিত কবর দেয়া হবে

জীবিত কবর

বিশ্বে যত বিখ্যাত ব্যক্তি মারা গেছেন তাদের সবাই ঠিক কি রোগে মারা গেছেন তাঁর হদিস আজও মেলেনি। যেমন সুরকার ফ্রেডেরিক চপিন মারা যাবার পর ১৫০ বছর লেগে গেছে বিজ্ঞানীদের তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারন বের করতে । ১৫০ বছর পর জানা যায় যে সুরকার ফ্রেডেরিক চপিন পেরিকার্ডাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন।

পেরিকার্ডাইটিস একটি বিরল রোগ যা যক্ষ্মার থেকে হয়। যার কারনে হৃদপিণ্ডের চারপাশে ফুলে যায়। হাইহোক এরপর বিজ্ঞানীরা তাঁর হৃদপিণ্ড নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

আপনার মনে হতে পারে এত বছর কিভাবে তাঁর হৃদপিণ্ড নিয়ে গবেষনা করবে। কিন্তু সত্য হল ১৮৪৯ সালে ফ্রেডেরিক চপিনের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর হৃদপিণ্ড যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়। এবং এই কথা স্বয়ং তিনি নিজেই বলে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে ফ্রেডেরিক চপিন বলে গিয়েছিলেন যেন তাঁর হৃদপিণ্ড বের করে রাখা হয় এবং তাকে পোলান্ডে তাঁর জন্মভূমিতে শায়িত করা হয়।

ন্যাচার ম্যাগাজিনের মতে মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ কথা ছিল “আমাকে শপথ কর যেন আমার হৃদপিণ্ড বের করে রাখা হয়, যাতে আমাকে জীবিত কবর দেয়া না হয়”।

তাফেফোবিয়া (taphephobia);

তাফেফোবিয়া একটি রোগের নাম যে রোগের কারনে মানুষের মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে সারাক্ষন যে তাকে হয়তো জীবিত কবর দেয়া হবে। অনেক আগে মানুষ মারা গেছে এটা বোঝার জন্য কোন যন্ত্র ছিলোনা। ডাক্তাররা শুধুমাত্র নিজেদের জ্ঞান এবং ধারনার উপর নির্ভর করে একজন মানুষকে মৃত ঘোষণা করতো।

ফ্রেডেরিক চপিনের ও এই তাফেফোবিয়া রোগ ছিল। এর কারনে তিনি সারাক্ষন ভয় পেতেন যে তাকে জীবিত কবর দেয়া হবে। তবে সেই সময় এই রোগটি খবই সাধারন ছিল। অনেক মানুষই জীবিত কবর দেয়াকে ভয় পেতেন।

জর্জ ওয়াশিংটন

জর্জ ওয়াশিংটন জীবিত কবর দেবার জন্য এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে তিনি চেয়েছিলেন যেন তাঁর মৃত দেহ কমপক্ষে তিনদিন বাইরে রেখে দেয়া হয় কেবলমাত্র তিনি মারা গেছেন তা নিশ্চিত করার জন্য। সারাহ মারে ‘মেকিং অ্যান্ড একজিট’ বইতে এমনটিই লিখেছেন।

আমেরিকার অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইজারসন এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। ইতিমধ্যে তিনি একটি বই ও লিখেছেন “ডেথ টু ডাস্ট” নামে।

তিনি বলেন ” আমরা জানি যে বাইবেলের সময়কালের আগেই জীবিত কবর দেওয়ার ভয় ছিল”। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন যীশু সেইসময় তাঁর বন্ধু লাসারকে মৃত থেকে জীবিত করেছিলেন। তখন এটা খুবই সাধারন ঘটনা ছিলো যে মৃত মানুষকে মুড়িয়ে গুহায় কবর দিয়ে আসা। তারপর কয়েকদিন পরে কেউ একজন এসে দেখে যেত আসলেই লোকটি মারা গেছে কিনা। দেখতে আসার কারন ছিল মাঝে মাঝে তারা আসলেই জীবিত মানুষকে কবর দিত এবং সে কবর থেকে উঠে আসত কিংবা জ্ঞান ফিরে আসত।

সুরকার ফ্রেডেরিক চপিন
সুরকার ফ্রেডেরিক চপিন

অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ ভুল করে জীবিত কবর দিত তবে, “তাদের কী রোগ ছিল তা সম্পর্কে আমরা ঠিক নিশ্চিত নই,” ইজারসন বলেছেন।

১৯শ শতকে সম্ভবত টাইফয়েডের কারনে কিছু মানুষকে জীবিত কবর দেয়া হয়েছিল। কারন টাইফয়েড হলে সাধারণত রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস খুব ধীরে চলে একারনে হয়তো মৃত ভেবে জীবিত কবর দিত। কিন্তু বিখ্যাত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঠিক কি হয়ছিল তা বলা খুবই মুশকিল। কারন সেই সময় মৃত ঘোষণা পদ্ধতি এখনকার থেকে ভিন্ন ছিল।

ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় সেইসময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধারনার উপর নির্ভর করে মৃত ঘোষনা করা হতো। আর একটি পদ্ধতি ছিল সেটা হল কেউ মারা যাবার পর কয়েকদিন বাইরে রেখে দেওয়া শুধু নিশ্চিত হবার জন্য।

ইজারসন বলেন “একবার ভাবুন তো আমরা কি আগের মত শুধু মানুষকে দেখেই মৃত বলি? না। এখন একজন মানুষকে মৃত বলতে আমরা যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে তারপর বলি।”

এই কারনেই সেই সময় অনেককেই জীবিত কবর দেয়া হয়েছিল। এমন বিংশ শতাব্দির কথাও বলা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ইসি ডানবারের কথা। যাকে সবাই মৃত বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু তাঁর বোন দেখতে চাওয়ার তাঁর কফিন খুলতেই সে উঠে বসে এবং হাসি দেয়। এর পরে সে আরো ৪৭ বছর বেঁচে ছিলেন।

ভিক্টোরিয়ান যুগে জীবন্ত কবর দেওয়ার ভয়টা সবচেয়ে মারাত্মক রুপ নেই। কারন এই সময় মানুষ এটাকে ব্যবসায় রুপ দেয় এবং নতুন কফিনের আবিস্কার করে। যে কফিনের নাম দেয়া হয় নিরাপদ কফিন। আর এই কফিনের মধ্যে যদি কেউ বেঁচে উঠে তবে যেন সে উপরের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। এর জন্য কফিনের ভিতর বেল রাখা হত। এমনকি কিছু কিছু কফিনে যেন খোলা যায় এই সিস্টেম ও রাখা হত।

এই কফিনের মধ্যে কবর দেয়া রীতিতে রুপান্তর হয় একরকম। কিন্তু অধ্যাপক ইজারসন বলেন ” এমন কোন প্রমান নেই যে এই কফিন আসলেই কারোর জীবন বাচিয়েছিল”। হাইহোক মানুষের মন থেকে জীবন্ত কবার দেয়ার ভয়টা চলে যেতে শুরু করে ১৯৫০ সালের পর থেকে। কারন এই সময় মানুষ বিজ্ঞানের দিক থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছে।

কিন্তু এখন যে আর কাউকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়না এমনটা নয়। এখন ও মাঝে মাঝে ভুলক্রমে জীবিত মানুষকে কবর দেয়া হয়।

2014 সালের নভেম্বরে, কবরদেয়ার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা একজন ৯১ বছর বয়সী পোলিশ মহিলাকে তার দেহের ব্যাগে চলাচল করতে দেখে আবিষ্কার করেছিলেন যে তিনি বেঁচে আছেন। একই বছরের প্রথম দিকে আরো দুটি ঘটনা ঘটে একটি কেনিয়াতে এবং একটি আমেরিকার মিসিসিপিতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here